বিশেষ ধারা বাতিল কাশ্মীরকে মুসলিম শূন্য করারই চক্রান্ত


কাশ্মীরে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং সেখানকার রাজনৈতিক দলের নেতাদের গৃহবন্দি করে রেখে রাজ্যটিতে কয়েক দশক ধরে আরোপিত ৩৭০ ধারা যা রাজ্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তা তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এই বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘোষণাটি হঠাৎ করে আসলেও এটি মোদি সরকারের কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং বিজেপি'র বহু পুরনো রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলোর একটি। এটিকে ভারতের একমাত্র মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য কাশ্মীরকে মুসলিম শূন্য করারই এক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা কেন এমনটা মনে করছেন তা অনুধাবন করতে হলে আমাদের আগে ৩৭০ ধারা সম্পর্কে জানতে হবে।জম্মু-কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা কি?
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অঙ্গ ছিল না। মহারাজা হরি সিং-এর অধীনে এখানে প্রচলিত ছিল স্বাধীন রাজতন্ত্র। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২২শে অক্টোবর কিছু পার্বত্য দস্সুরা কাশ্মীর আক্রমণ করলে, রাজা হরি সিং ভারতের কাছে সেনা সাহায্য চান ভারতভুক্তির (ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন) শর্তে। তাতে জম্মু-কাশ্মীরকে ৩৭০ নং ধারা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেবার ব্যবস্থা রাখা হয়। সে সময়ে বিনা পারমিটে কাশ্মীরে কেউ প্রবেশ করতে পারতো না। এই ৩৭০ ধারার মধ্যেই নিহিত আছে ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযুক্তিকরণের ইতিহাস।
এই ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর একটি ব্যতিক্রমী রাজ্য - কারণ প্রতিরক্ষা-পররাষ্ট্র বা যোগাযোগের মতো কয়েকটি বিষয় ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে সেখানে ভারতের কোনও আইন প্রয়োগ করতে গেলে রাজ্য সরকারের সম্মতিও জরুরি। নাগরিকত্ব, সম্পত্তির মালিকানা বা মৌলিক অধিকারের প্রশ্নেও এই রাজ্যের বাসিন্দারা বাকি দেশের তুলনায় বাড়তি কিছু সুবিধা ভোগ করেন। এটি জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতাও দেয়। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও রয়েছে এ রাজ্যের বাসিন্দাদের।
এই ৩৭০ অনুচ্ছেদের সুবাদে কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাই শুধুমাত্র সেখানে বৈধভাবে জমি কিনতে পারতেন, সরকারি চাকরি করার সুযোগ পেতেন এবং সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। এমনকি সেখানকার নারীরা কোনো অ-কাশ্মিরী পুরুষকে বিয়ে করলে তারা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। এতটাই কঠোর প্রয়োগ ছিল এ ধারাটির।
এখন এই ধারা রদ করার পর সেইসব বাধা পুরোপুরি উঠে যাবে। এরপর ভারতের অন্যান্য স্থানের হিন্দুরা পঙ্গপালের মত ছুটে আসবে উপত্যকার দিকে। অর্থের জোরে তারা দখল করবে নিঃস্ব দরিদ্র কাশ্মিরীদের পৈত্রিক ভূমির অধিকার। বলাবাহুল্য, ভারতীয় সেনাদের নির্যাতন ও নানা বৈষম্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই অবদমিত উপত্যকার জনতা।
অমুসলিমরা সেখানে এসে সেখানে এসে কেবল জমি কিনেই ক্ষান্ত হবেন এমন নয়, তারা সেখানে সরকারি চাকুরি ও বৃত্তিসহ নানা সুবিধা নেবে। অর্থাৎ দিনে দিনে গ্রাস করে নেবে গোটা উপত্যকা, যা নিয়ে এতদিন ধরে গর্ব করতো সেখানকার বাসিন্দারা।
আসেল এটি তো গোটা ভারতকে মুসলিম শূন্য করার চক্রান্তের একটি অংশ মাত্র, যা তারা দীর্ঘদিন ধরেই বাস্তাবায়িত করার সুযোগ খুঁজছিলো। এবারের ভারতের লোকসভা নির্বাচনে পার্লামেন্ট অকল্পনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কারণে মোদিরা নিজেদের এই চক্রান্তটি বাস্তবায়িত করার সুযোগ পেলো।
কেননা ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীর সংক্রান্ত ৩৭০ নং ধারা রদ করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিলো, যা রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞপ্তি জারি করে তা সংশোধন করতে পারেন। ইতিমধ্যে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ স্বাক্ষরও করেছেন।
কেবল কাশ্মীরে নয়, ভারতের বিভিন্ন অংশেই চলছে হিন্দুত্ববাদী শক্তির জবর দখল। কখনও তা বহিরাগত তাড়ানোর নামে (আসামের এনআরসি), কখনও বা অন্য কোনো মোড়কে।
এদিকে মোদি সরকারের কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘোষণায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে গোটা ভারত জুড়ে। বিরোধী দল কংগ্রেস কাশ্মীরের এই বিশেষ ক্ষমতা বাতিলের সমালোচনা করে বলেছেন, বিজেপি সংবিধানকে হত্যা করেছে।
আর কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মেহবুব আজকের দিনটিকে ‘অন্ধকারতম দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার অমিত শাহ বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘোষণা দেয়ার পরপরই এ নিয়ে টুইট করেন পিপল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা মুফতি মেহবুব। সেখানে তিনি বলেন, ‘আজ ভারতীয় গণতন্ত্রে অন্ধকারতম দিন হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মীরের নেতাদের দ্বিজাতি তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, এই ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে। এই অনুচ্ছেদটি বাতিল করার একতরফা সিদ্ধান্ত অবৈধ ও অসাংবিধানিক, যা ভারতকে জম্মু ও কাশ্মীরে একটি পেশাগত শক্তি হিসাবে পরিণত করবে।’

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ