র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী -এমপি, আছেন বলেই স্বপ্ন দেখি নিরন্তর---



🌸 আপাদমস্তক একজন রাজনীতিক হয়েও রাজনীতির বৃত্তকে পাশে রেখে কীভাবে সাংস্কৃতিক চিত্তকে ধারণ করে মানুষের অধিকার আদায় ও রাজনৈতিক ধারায় সংস্কৃতির বিচরণে নিজেকে মেলে ধরা যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সজ্জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরল সংস্করণ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি। শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর যে অনিবার্য উপস্থিতি ও অঙ্গীকার, বর্তমান সমাজের নিরিখে তার তাৎপর্য সীমাহীন।

ভিড়ের মধ্যে যে-মানুষ হারিয়ে যেতে চান, আসলে সেই মানুষকেই ভিড়ের মধ্যে সহজে চেনা যায়। চোখ-কান খোলা রেখে আমাদের চারপাশে একটু তাকালে সংখ্যায় অল্প হলেও এমন কিছু মানুষের উপস্থিতি এখনও আমরা দেখতে পাই, যাঁরা মানুষের জন্য মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যান। এমন স্বল্পসংখ্যক মানুষদেরই একজন উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, মানুষের ভিড়ে যাঁকে সহজে চেনা যায়। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর কেন্দ্রীয় নেতা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য। সাধারণ, অনাড়ম্বর, অন্তরের ঔজ্জ্বল্যতাকে আটপৌরে আস্তরণে ঢেকে রেখেছেন যিনি সব সময়। সহজেই তিনি যে-কাউকে ভালোবাসতে পারেন। এই জাদু সাধারণত সকলের থাকে না, যাঁদের থাকে তাঁরা সত্যিই বিরলপ্রজ। তিনি নিঃসন্দেহে সেই বিরলপ্রজদের একজন।

 নানা ধরনের লোকজন—সমাজের নানা স্তর থেকে ওঠে আসা, আচরণে-রুচিতে-বিচারে অনেক তফাত—কিন্তু এঁদের সবাইকেই তিনি চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেন। আকর্ষণ করেন তাঁর অসাধারণ সাধারণত্ব দিয়ে। যারা তাঁর কাছে আসেন, কেমন করে তারা যেন বুঝে যান এই মানুষটির মধ্যে কোনও ঘোরপ্যাঁচ নেই, এই মানুষটির কাছে তাই খোলাসা হওয়া যায়, অকপট কথা বলার মর্যাদা দেবেন এই মানুষটি, অকপট মন নিয়ে যে-কথাগুলো বলা হবে, তা তিনি শুনবেন—অকপট মন নিয়ে, মনোযোগ দিয়ে; শোনার পর রেখে-ঢেকে কিছু বলবেন না, সরল ভাষায় সরল উপদেশ দেবেন, অকপট সাচ্চা উপদেশ। ভর্ৎসনার প্রয়োজন হলে উপদেশের সঙ্গে তা-ও জড়িয়ে থাকবে অকপট ভাবেই। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যা থাকবে তা হলো ভালোবাসা—নিখাদ ও অতল ভালোবাসা। যে-মানুষ নিখাদ ভালো, এমন করে ভালোবাসা কেবল তিনিই ছড়িয়ে দিতে পারেন। উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীও তা পারেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নিখাদ ভালো মানুষ বলেই তিনি তা পারেন। আমরা বিভিন্ন পণ্ডিত-মনীষীর লেখা পাঠে জেনেছি একজন ভালো নেতা হতে গেলে কী কী গুণাবলি প্রয়োজন। কিন্তু আমার মনে হয়, একজন উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর মতো মানুষের দৃষ্টান্ত দেখার পর আর ঐ গোছের পাঠের প্রয়োজনীয়তা বোধহয় খুব একটা নেই। একজন ভালো নেতা হতে গেলে সর্বাগ্রে ভালো মানুষ হতে হয়। ভালো মানুষ, যিনি নিজের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির প্রসঙ্গ দূরে সরিয়ে রেখে পড়শীর শুভাশুভ নিয়ে সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে বেশি ভাববেন। যিনি নিজেকে কখনো জাহির করবেন না। অন্যকে যিনি ভালোবাসা দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে অনুপ্রাণিত করবেন। যিনি আদর্শে স্থিত থাকবেন, কিন্তু আদর্শের সঙ্গে যারা একাত্ম নন, তাদের সম্পর্কে অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন না।

যিনি সৌভাগ্যবান ঋতুতে হাজির হওয়া অনুরাগীদের ভিড়ের ঠেলায় সংকটের দিনের বন্ধুদের হারিয়ে যেতে দেবেন না। যাঁর সকলের সঙ্গেই আলাদা করে কথা বলার সময় আছে, প্রত্যেকের সংসারের খুঁটিনাটি খবর নেওয়ার সময়, অসুখের খবর-আনন্দের খবর নেওয়ার সময়; যিনি অপরের দুঃখকে ভাগ করে নিতে জানেন, যেমন জানেন অপরের আনন্দে সমান দীপ্যমান হয়ে উঠতে। এসবই তো একজন ভালো মানুষ, একজন ভালো নেতার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর উপস্থিতি যেসব মানুষ বা যেসব নেতার চরিত্রে রয়েছে, তাঁরাই জনতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন। কিন্তু ওই একই কারণেই জনতার ভিড়েও চোখে পড়েন এই মানুষগুলোই। তাঁদের ত্যাগ দিয়ে, অধ্যবসায় দিয়ে, বিনয়-নম্রতা-আদর্শনিষ্ঠা-কর্তব্যপরায়ণতা-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়ে জনতাকে সংহত, সংঘবদ্ধ করে তুলেছেন তাঁরাই তো। নিজেদের কথা আলাদা করে তাঁরা কোনোদিন বলেন না, তাঁদের বিবেচনায় তা অবিনয় বলে মনে করেন তাঁরা।

অথচ তাঁদের ব্যক্তিগত কাহিনি নিছক তাঁদেরই কাহিনি নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুদীর্ঘ আন্দোলনের কাহিনি, সংগঠন তৈরির কাহিনি, অত্যাচারিত-নিপীড়িত মানুষকে ভালোবাসার কাহিনি; অনেক দুর্যোগ, অনেক সংকট, অনেক সাহসের কাহিনি, সাময়িক পরাজয়ের কাহিনি, সেই সঙ্গে অনেক দায়বদ্ধতা-শপথ-প্রতিজ্ঞার কাহিনিও। তেমনই এক জীবন্ত কাহিনির নাম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। যিনি তাঁর স্বীয় অনন্যসাধারণ কর্মশক্তি বলে অবলীলাক্রমে অসংখ্য অসাধ্য কাজ সম্পন্ন করেছেন, কিন্তু কখনওই তিনি সাফল্যের গর্বে আত্মহারা হননি।

এমনকি কেউ তাঁর সামনে ঐ-সকল প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, ‘আমি যা করতে চাই, তার তুলনায় যা করেছি তা কিছুই নয়’। তাঁর চরিত্র ইস্পাতের মতো কঠিন এবং সহজ-নমনীয়। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, জ্ঞানের গভীরতা, তাঁর চিন্তাপ্রণালীর আশ্চর্য শৃঙ্খলা এবং অগ্রগতির অদম্য স্পৃহা তাঁকে কখনও অলস থাকতে দেয় না। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ততোধিক ক্ষিপ্রতায় তা কার্যে পরিণত করার শক্তি তাঁকে একজন সফল মানুষ ও ভালো নেতার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। মানুষ চিনতে তাঁর কখনওই ভুল হয় না। বিশাল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দলের এবং নিজ নির্বাচনী এলাকার অধিকাংশ মানুষই তাঁর সুপরিচিত। সহকর্মী ও দলের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য রাখেন না। জনগণ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে রহস্যময় জীবনের মোহজাল দ্বারা জনমণ্ডলিকে আচ্ছন্ন করার মতো মনোবৃত্তি তাঁর নেই, কখনওই ছিলও না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকেও আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন।

আলাপ-আলোচনায় সদালাপী ও হাস্যোজ্জ্বল এ মানুষটা কোনো বিষয় আলোচনাকালে যখন বক্তার ভূমিকায় থাকেন, অথবা কোনো ভ্রান্ত যুক্তি খণ্ডন করেন, তখন তাঁর জ্ঞানের ঔজ্জ্বল্যে প্রতিটি কথা শাণিত তরবারির মতো ঝলসে ওঠে। তিনি সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের একজন, যাঁরা একই সঙ্গে জাতির জনক ও তাঁর কন্যাদ্বয়ের অবারিত স্নেহে সিক্ত হয়েছেন। বরং তাঁর ক্ষেত্রে আরও একটি বাড়তি প্রাপ্তি—তিনি জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালেরও ছিলেন অনুজপ্রতীম ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

এমন একজন সজ্জন মানুষ সম্পর্কে কিছু লিখতে বসে যে কাউকেই প্রথমেই যা চমৎকৃত করবে তা হলো তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের বৈচিত্র্যতা, ব্যাপকতা ও বহুমুখীনতা। তিনি আদর্শিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির এক মূর্ত প্রতীক, তীক্ষ্ণ ধী সম্পন্ন লেখক, পরমত সহিষ্ণু সম্পাদক, সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক, শিক্ষানুরাগী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাহত বীর সেনানী। ছিলেন জনহিতৈষী সফল আমলাও। আর এর প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সচেতনভাবে চেষ্টা করেছেন গতানুগতিকতা পরিহার করতে। যেমন, লেখক হিসেবে তীক্ষ্ণ কিন্তু স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাবলীল রচনাশৈলীর মাধ্যমে তিনি পাঠকবর্গকে এমন কয়েকটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন যা তাঁকে তাদের চিত্তে একটি সমাদৃত ও সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

আপাদমস্তক একজন রাজনীতিক হয়েও রাজনীতির বৃত্তকে পাশে রেখে কীভাবে সাংস্কৃতিক চিত্তকে ধারন করে মানুষের অধিকার আদায় ও রাজনৈতিক ধারায় সংস্কৃতির বিচরণ সৃষ্টিতে নিজেকে মেলে ধরা যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর উন্মুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির গোড়াপত্তনে জাতির জনক যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তারই আদর্শিক সন্তান মোকতাদির চৌধুরী আশৈশব বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত সৎ, পরিচ্ছন্ন, পরোপকারী ও সংস্কৃতিবান একজন ব্যক্তিত্ব। সবসময় তিনি উপলব্ধি করেন, যে কোনো মহৎ কাজ পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত সুসম্পন্ন হতে পারে না। এজন্যেই বোধহয় তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক পরিবেশ বিনির্মাণের পাশাপাশি একদিকে যেমন শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন, অন্যদিকে সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতির চর্চায়ও অকৃপণ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কবি-সাহিত্যিকদের যথেষ্ট মূল্যায়ন ও সম্মান করেন, তাঁদের প্রতি তাঁর রয়েছে প্রগাঢ় ভালোবাসা। কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতি কর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিমূল শক্ত করার পাশাপাশি লুপ্তপ্রায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারেও উল্লেখযোগ্য সহযাত্রী তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন চত্বরটিকে ‘শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষাচত্বর’ নামকরণ করা, জেলা শহরের সবচেয়ে বড় মিলনায়তনটির নামকরণ ‘সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র নামে করা এর উৎকৃষ্ট সাক্ষ্য বহন করে।

এ-তো গেল তাঁর নিজ এলাকার কথা। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে'র একটি স্মৃতিফলক ছিল ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ রেলব্রিজসংলগ্ন শ্মশানঘাটে। একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনী স্মৃতিফলকটি গুঁড়িয়ে দিলে দীর্ঘদিন এটি পড়েছিল চরম অবহেলায়! কবিদের সংগঠন ‘বাঙ্ময়’-এর ব্যানারে ময়মনসিংহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত আলেক জান্ডার ক্যাসেলের পাশে বরেণ্য শিক্ষাবিদ-লেখক-গবেষক অধ্যাপক যতীন সরকার ও বরেণ্য কবি আবু হাসান শাহরিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে ফলকটি পুনঃস্থাপন করেন র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। একই ব্যানারে ঢাকার শাহবাগে বর্ণিল এক কবিতা মেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল চিন্তাশীল সাময়িকী ‘মত ও পথ’। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ২০০৯-এর ১৫ই আগস্ট জাতির জনকের শাহাদৎ বার্ষিকীতে উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশনার যাত্র শুরু করে ‘মত ও পথ’, গতানুগতিকতার বাইরে, ভিন্ন ধাঁচের একটি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পাক্ষিক সাময়িকী।

তখন থেকেই বাংলাদেশের সাময়িক পত্রিকার ইতিহাসে আক্ষরিক অর্থেই ভিন্ন ধাঁচের একটি পত্রিকার যাত্রা শুরু, যার প্রকাশনা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আজও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের চিন্তাশীল সাময়িকীর ইতিহাস লিখতে গেলে নিরপেক্ষ যে-কোনও ইতিহাসবিদের পক্ষেই পাক্ষিক ‘মত ও পথ’কে বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না। আরও স্পষ্ট করে বললে, ‘মত ও পথ’কে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সাময়িকপত্রের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা যাবে না। কারণ, হাতেগোনা সর্বোচ্চ দুই কি তিনটি সংখ্যার কথা বাদ দিলে দীর্ঘ প্রায় এক দশকের পথচলায় এ-সাময়িকীটির প্রকাশনা বন্ধ থাকেনি। ফলে ‘মত ও পথ’ নিজেই এখন একটি ইতিহাস। একটি ভালো সাময়িকী জীবনভর নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য তথ্য-উপাত্তসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার জোগান দেয়।

 বাংলাদেশে বর্তমানে খুব কম সংখ্যক সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক পত্রিকা আছে যেগুলো থেকে পাঠক তার ভবিষ্যতের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। কিন্তু যে গুটিকয় ভালো সাময়িকী আছে, তার মধ্যে ‘মত ও পথ’ অতি- অবশ্যই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এ উল্লেখযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে যে মানুষটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, তিনি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সাময়িকীটির স্বপ্নদ্রষ্টা-সম্পাদক-প্রকাশক। তাঁরই একক পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যপত্রিকা ‘প্রতিবুদ্ধিজীবী’র ব্যানারে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একাধিকবার অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্য সম্মেলন ও কবিতা উৎসব। প্রসঙ্গক্রমে কৃতজ্ঞতার সাথে উল্লেখ্য যে, আমার সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘প্লাটফর্ম’-এর প্রধান উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকও তিনি।

এত সব ছাপিয়েও তাঁকে যে জন্যে বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতি কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ দীর্ঘদিন মনে রাখবেন, তা ২০১৬’য় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসব’। সে বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর ও তাঁর নিজ গ্রামে একযোগে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসব। ওই উৎসবে বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙলাভাষী বিভিন্ন রাজ্যের বঙ্গ-সংস্কৃতির প্রায় শতাধিক খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক-ইতিহাসবিদ-শিক্ষাবিদ-ভাষাবিদ মণিমুক্তোদের নিয়ে গ্রথিত হয়েছিল বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসবের মালা। যার পুরোভাগে ছিলেন উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। তাঁর একক পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হয় ওই উৎসব। শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট অনেকেই যখন মনে করেন সংস্কৃতিচর্চার মূল কেন্দ্রই হচ্ছে ঢাকা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক সংস্কৃতি কর্মীই যখন নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসছেন শুধু তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য, তখন কেন্দ্রে থেকেও উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন নিরলসভাবে। তিনি মনে করেন, এর জন্যে সংস্কৃতির বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে হবে প্রান্তিক জনপদে।

এ ভাবনা থেকেই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বুকে যখন ভয়ানক এক কৃষ্ণপক্ষ বিরাজমান, মৌলবাদী তাণ্ডবে গোটা শহর যখন বিধ্বস্ত, সেই বেদনার বিতৃষ্ণার মাঝেও একটি মফস্বল শহর এবং অজপাড়াগাঁয়ে তাঁর আন্তরিক আগ্রহ ও ইচ্ছায় এবং তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় তাৎপর্যপূর্ণ বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসবটি। এক বা দু-দিনের নয়, টানা তিন দিনের আয়োজন। এটি বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে স্থানীয় প্রয়াস হলেও প্রগতিশীল চেতনার সার্বিক চিন্তার প্রকাশ যেমন ঘটেছে তাতে, তেমনি প্রকাশ ঘটেছে সংস্কৃতির প্রতি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার বিষয়টিও। আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, অভিজাতও বটে। বিস্তৃত পরিসরে এখানে তুলে ধরা হয় বঙ্গদেশ, বাংলা ভাষা ও বাঙালির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে। রাজধানী ঢাকা থেকে উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক-শিল্পীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা। যুক্ত করা হয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গকেও। কলকাতা, ত্রিপুরা ও আসাম থেকেও আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন বিদগ্ধ জনেরা। সবাই মিলে জয়গান করেছেন বঙ্গ-সংস্কৃতির। আকালের এই কালে আয়োজনটির বিশেষ মূল্য বারবার ফিরে দেখার দাবি রাখে।

২০১৬’র ৯ জানুয়ারি শুরু হয়ে এ-উৎসব চলে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত। সেমিনার, কবিতা, লোকগানসহ লোকসংস্কৃতির নানা পরিবেশনায় টানা তিন দিন মুখরিত ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কিংবা ইতিহাসের সম্মেলন নয়। একটি সার্বজনীন সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎসব। এ উৎসবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বঙ্গ-সংস্কৃতি ঘিরে কত রকমের আলোচনা! সুলিখিত প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা, নানামুখী বিশ্লেষণ। সব মিলিয়ে উৎসবকে অর্থবহ করে তুলে। তা ছাড়া উৎসব মঞ্চে প্রতি দিনই ছিল কবিতা। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছেন খ্যাতিমান ও প্রতিশ্রুতিশীল কবিরা। অনুষ্ঠানে কবি ও কবিতা বিষয়ক আলোচনার আয়োজনও করা হয়। তাতে বাংলাদেশ ও ভারতীয় কবিরা তুলে ধরেন কবিতার সমকালীন ভাবনা। ছিল দেশসেরা আবৃত্তিশিল্পীদের মনোমুগ্ধকর আবৃত্তি পরিবেশনাও।

সংগীতের ভাষায়ও ফুটিয়ে তোলা হয় বঙ্গ-সংস্কৃতি। বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির পরিসরে বিচিত্রানুষ্ঠানে সমৃদ্ধ তিনটি দিন, প্রান্তিক মানুষদেরও বঙ্গ-সংস্কৃতির সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করতে সাহায্য করেছে। সমগ্র উৎসবজুড়েই ছিল এই ধরনের অজস্র আয়োজন। যা বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ক্যানভাসে নিজস্ব জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। মৌলবাদী তাণ্ডবও যে আমাদের সংস্কৃতির প্রবহমানতাকে দমিয়ে রাখতে পারে না, তার প্রমাণ বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসব। সত্য সুন্দরের এই উৎসবের মাঝেই ফুটে ওঠে বাংলাদেশ। যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে জঙ্গি গোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে সুন্দরের বিরুদ্ধে, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে রুখে দাঁড়ায় শিল্প। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বঙ্গ-সংস্কৃতি উৎসব। উৎসব উপলক্ষে একটি সমৃদ্ধ প্রকাশনাও বের করা হয়। ৪৮০ পৃষ্ঠার এ-সংকলনটিতে বঙ্গ-সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে বাংলা ভাষার বিখ্যাত বহু লেখকের লেখা স্থান পায়, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণে রাখার মতো। ঢাকার বাইরে কোনো মফস্বল শহরে এমন আয়োজন বঙ্গ-সংস্কৃতির প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ছাড়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সহজও নয়। কিন্তু যাঁদের প্রেম-শ্রম ও বঙ্গ-সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা আয়োজনটিকে সফল করেছে, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে যে নামটি উচ্চারিত হয়, তিনি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।

বাংলাদেশের শতকরা দশজন রাজনীতিক:-সাংসদও যদি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর মতো মুক্তমনা, চিত্তশালী, শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ ও উদার পৃষ্ঠপোষক হতেন, তাহলে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল যেমন আরও সমৃদ্ধশালী হতো, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিরাজ করতো আরো সহস্র গুণ সুন্দর পরিবেশ।
শিক্ষা ও শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তিনি যে আত্মত্যাগ -নিষ্ঠা-বিনয়-দায়বদ্ধতা-সততা-মমতা ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এবং শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর যে অনিবার্য উপস্থিতি ও অঙ্গীকার, বর্তমান সমাজের নিরিখে তার তাৎপর্য সীমাহীন। আর এভাবেই তিনি বিপুল কর্মযজ্ঞের গুণে হয়ে উঠেছেন, স্বকালের শিক্ষা-সংস্কৃতির বাতিঘর।

লেখক- শেখ এমরানুল ইসলাম
সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিজয়নগর উপজেলা শাখা,

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ